অভিষেক সেনগুপ্ত, জলপাইগুড়ি: কথিত রয়েছে, তখন সত্য যুগ। বৈশাখের শুক্লপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে তখন দিন না রাত, গোধূলি। ঘরেও নয়, বাইরেও নয়, চৌকাঠ। মাটিতেও নয়, আকাশেও নয়, ঊরুতে। এই ঊরুতেই বিষ্ণুভক্ত শিশু পহ্লাদের প্রাণশংশয়কারী পিতা হিরণ্যকশিপুকে নখরে হত্যা করেন বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার নৃসিংহদেব। এই অবতারের একমাত্র মন্দির রয়েছে শহর জলপাইগুড়িতেই। শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডে হাইস্কুল লাগোয়া পুকুরের ধারে এই মন্দির দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল। তবে, ফি দিন পুজো দিয়ে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে যান ভক্তরা। এদিকে, হাইস্কুল লাগোয়া ঐতিহ্যবাহী পুকুরটি সংস্কার করতে গিয়ে ওই মন্দির ও মৃন্ময়ী প্রতিমার কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মন্দিরটির মেরামতি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ক্ষিপ্ত হয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিজেপির জেলা মুখপাত্র শ্যাম প্রসাদ। পাল্টা, ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলার মণীন্দ্রনাথ বর্মণ জানান, ঠিকাদার মেরামতির আশ্বাস দিয়েছেন ব্যবস্থা নেবেন।

একদিকে বিশ্বযুদ্ধের দামামা। অন্যদিকে, লাল-মুখো সাহেবদের অনেকে এ দেশ থেকে তল্পিতল্পা গুটোনোর কথা ভাবাও শুরু করছেন। বছরখানেকের মধ্যেই দেশজুড়ে শুরু হতে চলেছে ‘ভারত ছাড় আন্দোলন’। আন্দোলনের আঁচ জলপাইগুড়ি শহরেও। সেই সময়ই, ১৯৩৯-৪০ সালে শহরের জয়ন্তীপাড়া এলাকায় সাধারণভাবেই নৃসিংহদেবের মন্দির স্থাপনা হয় বলে দাবি। নিয়মিত পুজো-আচ্চাও চলতে থাকে স্থানীয়া ‘গোপাল বুড়ির’ জায়গাতেই গড়ে ওঠা এই মন্দিরে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। তাদের দাবি, অষ্টধাতুর মূল মূর্তি রাখালদেবী থেকে আসা পূজারির বাড়িতে রয়েছে। মৃন্ময়ী প্রতিমায় পুজো হয় এখানে। প্রচুর মানুষ আসেন বার্ষিক পুজোয়।

পুকুর সংস্কারে জেসিবি-র ব্যবহারের কারণে মন্দির ও মূর্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মন্দিরে দেখা গেল পুরান ইট সার বেঁধে রাখা রয়েছে। অর্ধসমাপ্ত শেডও চোখে পড়ল। তবে, ঈশ্বরের থান শূন্য। টিন দিয়ে ঘেরা চত্বরের মূল ফটকে তালা। বিকেলে পূজারি এলে হবে পুজো। এই মন্দিরের দ্রুত সংস্কার ও উন্নয়নের দাবি তুলেছেন রুক্মিনী সরকার-সহ স্থানীয়রা।

ইতিহাসবিদ আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, ‘স্বাধীনতার বেশ কয়েক বছর আগেই ওখানে নিম্নবর্ণীয়রা মন্দির গড়ে পুজো করতেন। স্বাধীনতার আগে-পরে উদ্বাস্তুরা আসায় ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। উত্তর প্রদেশেও নৃসিংহদেবের মন্দির রয়েছে। তবে, জলপাইগুড়িতে এটিই একমাত্র।”


বর্ষীয়ান শহরবাসী জ্যোতিপ্রসাদ রায় বলেন, “এ বিষয়ে অনেকেই জানেন না। এই মন্দিরকে নতুন করে গড়ে তোলা হোক।’

ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দা তথা জেলা বিজেপির মুখপাত্র শ্যাম প্রসাদ বলেন, ‘ছেলেবেলা থেকেই এই মন্দির দেখে এসেছি। পুজোয় অংশ নিতাম। এক সাধু থাকতেন। সবার সহযোগিতা নিয়েই মন্দিরের উন্নয়ন হবে। বিধায়ককেও বলেছি।’ তার আরও সংযোজন, হাইস্কুল লাগোয়া পুকুর সংস্কার করতে গিয়ে মন্দিরের ক্ষতি হওয়ায় ভক্তদের ভাবাবেগে আঘাত লেগেছে। এর দায় নিয়ে ঠিকাদার মন্দিরটি ঠিকঠাক না করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। এটি শহরের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত।”
ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলার মনীন্দ্রনাথ বর্মণ বলেন, “ওই মন্দির সংস্কার ও উন্নয়নে আমাকে না রাখলেও সনাতনী হিসেবে স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নেব। ঠিকাূার সংস্কার করবেন বলে কথা দিয়েছেন।” এদিকে মন্দির কমিটির তরফেও কিছু কাজ করা হচ্ছে বলে দাবি।


